বিনিয়োগের নেই, কর্মসংস্থানের কী হবে

বিনিয়োগের নেই, কর্মসংস্থানের কী হবে

অন্তবর্তী সরকারের ছয় মাস পার হয়েছে। কিন্তু কোনো সুখবর নেই। সর্বত্র হতাশা, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা কমে গেছে। ব্যবসা সম্প্রসারণও থমকে গেছে। বিদ্যমান পরিপ্রেক্ষেতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন না।

মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে নীতি সুদহার বাড়িয়েই চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক; উঠেছে ১০ শতাংশে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ করছেন না। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের ছয় মাস পার হতে চলেছে। এখনও দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসেনি। আইন শৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে; দিন যতো যাচ্ছে, পরিস্থিতি ততোই খারাপের দিকে যাচ্ছে।

সবশেষ গত ৫ ফেব্রুয়ারি বুধবার রাতে বুলডোজারে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ধানমন্ডি ৫ নম্বরে শেখ হাসিনার বাসভবন সুধা সদন। একই রাতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ সরকার আমলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতাদের বাড়িতে হামলা হয়েছে।

এমন হামলা বৃহস্পতিবার রাতেও হয়। এ পরিস্থিতিতে শুক্রবার রাতের প্রথম প্রহরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা শক্তভাবে প্রতিহত করার কথা জানানো হয় অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকে।

শুক্রবার বিকালে আরেক বিবৃতিতে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদদের কারও সম্পত্তিতে আর কোনও হামলা না করার আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।

গাজীপুরে শুক্রবার রাতে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে হামলা চালিয়েছেন বিক্ষুব্ধ জনতা। এ সময় স্থানীয় কিছু ব্যক্তি তাদের কয়েকজনকে আটক করে মারধর করেন। এতে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার থেকে সারা দেশে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করবে যৌথ বাহিনী। এ অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগ থেকে আজ পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ অভিযানের কথা জানানো হয়েছে।

সবমিলে সারা দেশে অস্থিরতা ও থমথমে অবস্থা বিরাজ করায় সবাই ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে আছেন। আগামীতে বাংলাদেশের পরিণতি কি হবে- তা নিয়ে ছোট-বড় সব ব্যবসায়ী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর বড় ব্যবসায়ীদের বেশ কয়েকজন আছেন কারাবন্দি। অনেকে গা ঢাকা দিয়েছেন; বিদেশেও পালিয়ে গেছেন কেউ কেউ।

এমন পরিস্থিতিতে দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমে ৭ শতাংশে নেমে এসেছে; যা গত দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। নতুন বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান নির্দেশক মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানি তলানিতে নেমেছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও কমছে। দেশে শিল্প স্থাপনের নতুন উদ্যোগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ স্থবির হয়ে আছে; ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের মধ্যে ভয়-আতঙ্ক বিরাজ করছে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগে অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে।

রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগকারীদের কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। অন্তবর্তী সরকারের ছয় মাস পার হয়েছে। কিন্তু কোনো সুখবর নেই। সর্বত্র হতাশা, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা কমে গেছে। ব্যবসা সম্প্রসারণও থমকে গেছে। বিদ্যমান পরিপ্রেক্ষেতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন না। বিনিয়োগের ওপর এমন নেতিবাচক প্রভাবের কারণে নতুন কর্মসংস্থান সেভাবে সৃষ্টি হচ্ছে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন স্নাতকদের চাকরি দিতে পারছে না।

বৃহস্পতিবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংক ‘উইকলি সিলেক্টেড ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ষষ্ঠ মাস এবং গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির তথ্য আছে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে। এসব তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, এত কম প্রবৃদ্ধি গত দশ বছরে কখনও হয়নি।

করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালের মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশে নেমে এসেছিল।

আগের মাস নভেম্বরে এই হার ছিল ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অক্টোবরে ছিল ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ; সেপ্টেম্বরে ছিল ৯ দশমিক ২০ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ; প্রথম মাস জুলাইয়ে এই প্রবৃদ্ধি ছিল দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ।

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ব্যবসার পরিবেশে অনিশ্চয়তা আর ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদহারের প্রভাবে গত কয়েক মাস বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমছে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছে ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। সে হিসাবে নভেম্বরের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ দশমিক ৫২ শতাংশ পয়েন্ট কম।

তবে মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বাড়িয়ে বেসরকারি ঋণে লাগাম দিয়েছে, সেই মূল্যস্ফীতি খানিকটা কমেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, নতুন বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি বা মাসভিত্তিক) দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে এক অঙ্কের ঘরে (সিঙ্গেল ডিজিট) ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে নেমে এসেছে। চার মাস পর এই সূচক সিঙ্গেল ডিজিটে নামল।

গত বছরের জুন মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। জুলাইয়ে তা বেড়ে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে ওঠে। আগস্টে তা কিছুটা কমে হয় ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। পরের মাস সেপ্টেম্বরে তা আরও কমে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ হয়।

এরপর থেকে তা ১০ শতাংশের উপরেই অবস্থান করছিল। নতুন বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে এই সূচক ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনও দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) রয়েছে। জানুয়ারিতে এই হার ছিল ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।

অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার মানে হলো ব্যবসা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ কমে যাবে। সেই সঙ্গে কমবে নতুন শিল্প স্থাপন বা শিল্প সম্প্রসারণের গতি। অবধারিতভাবে তার প্রভাব পড়বে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরু থেকেই অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সারা দেশ উত্তাল হতে শুরু করে। একপর্যায়ে ছাত্রদের আন্দোলনে সহিংস ঘটনায় দেশে চরম অস্থিরতা দেখা দেয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ৫ আগস্ট ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই অস্থিরতা আরও বাড়ে। দেশে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়। সেই পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২২ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক শূন্য সাত শতাংশে উঠেছিল। এরপর থেকে কমছেই।

২০২৩ সালের মে মাসে এই প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১১ দশমিক ১০ শতাংশ। তার আগের মাস এপ্রিলে ছিল ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। মার্চে ছিল ১২ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ। জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১২ দশমিক ৬২ শতাংশ।

২০২২ সালের ডিসেম্বরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৮৯ শতাংশ। নভেম্বরে ছিল ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। অক্টোবর, সেপ্টেম্বর ও আগস্টে ছিল যথাক্রমে ১৩ দশমিক ৯১ শতাংশ, ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ ও ১৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।

২০২১ সালের শেষ মাস ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। তার আগের মাস নভেম্বরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১০ দশমিক ১১ শতাংশ; অক্টোবরে ৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ আর সেপ্টেম্বরে হয়েছিল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আগস্ট ও জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল যথাক্রমে ৮ দশমিক ৪২ শতাংশ ও ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

করোনা মহামারির ধাক্কায় কমতে কমতে ওই বছরের মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশে নেমে এসেছিল।

এ প্রসঙ্গে এআরএইচ ডট নিউজ কথা বলেছে বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ব্যাংকের নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক সভাপতি সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সঙ্কোচনমুখী মুদ্রানীতি গ্রহণ করছে। ফলে সব ধরনের ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে।

এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনেরও একটা প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন এবিবির সাবেক সভাপতি।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “যেকোনো দেশের বিনিয়োগের পূর্বশর্ত হচ্ছে বিনিয়োগ সহায়ক অনুকূল পরিবেশ। বর্তমানে দেশে স্থিতিশীলতা নেই; অনিশ্চয়তা আছে। আগামী দিনগুলো কী হবে, নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। এমন অবস্থায় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা অপেক্ষা করছেন, যার প্রভাবে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “দেশে অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। দিন যতো যাচ্ছে, অবস্থা ততোই খারাপের দিকে যাচ্ছে। কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না। সংঘাত-নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে সবার মধ্যে ভয়-আতঙ্ক বিরাজ করছে।

“এমন পরিস্থিতিতে ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী- কেউই ঠিকমতো ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারছেন না। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। এর অংশ হিসেবে নীতি সুদহার বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে।”

দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ চেম্বারের বর্তমান সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ এআরএইচ ডট নিউজকে বলেন, “দেশে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। সবার মধ্যে ভয়-আতঙ্ক বিরাজ করছে। সর্বত্র অনিশ্চয়তা-অস্থিরতা; কোথাও স্বস্তি নেই। এ অবস্থায় বিনিয়োগ করবে কে? ঋণ নেবে কে?”

তিনি বলেন, “করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের দর বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ- একের পর এক ধাক্কায় বেশ কিছুদিন ধরেই আমাদের অর্থনীতি চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এরই মধ্যে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর লেগেছে আরেক ধাক্কা। পোশাক শিল্পের অস্থিরতা আমাদের আরেক চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়েই চলেছে। মূল্যস্ফীতি বাড়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।”

“এমনটা চলতে থাকলে আমাদের কপালে কী আছে কে জানে”, যোগ করেন আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ।

এডিপি বাস্তবায়নের কী অবস্থা

২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অর্থ ব্যয় হয়েছে মোট বরাদ্দের মাত্র ১৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ; আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যা ছিল ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সম্প্রতি এডিপি বাস্তবায়নের এই তথ্য প্রকাশ করেছে।

জুলাই ঘিরে আন্দোলন, নৈরাজ্য আর অগাস্টে ক্ষমতার পালাবদলে তৈরি হওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে থমকে যাওয়া উন্নয়ন কাজের প্রভাবে এডিপি বাস্তবায়নের হার ১৫ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিন্মে নেমেছে।

আইএমইডির ওয়েবসাইটে ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে তথ্য পাওয়া যায়। এতে দেখা যায়, ওই অর্থবছর থেকে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এর থেকে কম এডিবি বাস্তবায়ন হয়নি।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার চলতি অর্থবছরে এডিপিতে ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখে বাজেট পাস করেছিল।

বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ৭১ শতাংশ

অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় দেশে এখন বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না বললেই চলে।

ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) মাত্র ২১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের নিট এফডিআই (সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ) এসেছে দেশে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৭৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

এ হিসাবে এই ছয় মাসে এফডিআই কমেছে ৭১ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি কমেছে ৩২ শতাংশ

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) পণ্য আমদানির এলসি (ঋণপত্র) খোলার তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তাতে দেখা যায় এই ছয় মাসে বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য মোট ৩ হাজার ৪৮৯ কোটি ৯২ লাখ (৩৪.৮৯ বিলিয়ন) ডলারের এলসি খুলেছেন ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি। নিস্পত্তি বেড়েছে ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই ছয় মাসে ৩৩ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল।

তবে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাপিটাল মেশিনারি (মূলধনী যন্ত্রপাতি) আমদানির এলসি কমেছে ৩২ দশমিক শূন্য চার শতাংশ; নিস্পত্তি কমেছে ২৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

এই ছয় মাসে ৮৭ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে; গত অর্থ বছরের একই সময়ে ছিল ১২৮ কোটি ৫২ লাখ (১.২৮ বিলিয়ন) ডলার।

শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য (ইন্টারমেডিয়েট গুডস) আমদানির এলসি কমেছে ৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ; নিস্পত্তি কমেছে ১৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

জ্বালানি তেল আমদানির এলসি কমেছে ৮ শতাংশ; নিস্পত্তি কমেছে দশমিক ২৬ শতাংশ।

দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-সিপিডি।

গত ২৯ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০২৪-২৫ : সংকটময় সময় প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দেশে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা না থাকলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ে না। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিৎ দ্রুত নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা।

সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ডিসেম্বর থেকে পরের বছর জুনের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার কথা বলেছে। আমরা চাই, সরকার ঘোষিত রোডম্যাপের মধ্যেই নির্বাচন হোক। যত দ্রুত সম্ভব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যেতে হবে। তা না হলে দেশে স্থিতিশীলতা আসবে না। বিনিয়োগ হবে না। কর্মসংস্থান বাড়বে না।”

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের লকার খোলার অনুমতি পেল দুদক পরবর্তী

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের লকার খোলার অনুমতি পেল দুদক

কমেন্ট