দেড় মাসে ৬ দফায় সোনার ভরি বাড়ল সাড়ে ১১ হাজার টাকা
১১ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের বাজারে এক গ্রাম ২২ ক্যারেট সোনা কিনতে ১২ হাজার ৮৪৪ টাকা লাগছে। ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রামে এক ভরি হিসাবে প্রতিভরি কিনতে লাগছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮১২ টাকা।
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে দেশের বাজারে সোনার ভরি প্রায় দেড় লাখ টাকায় উঠেছে। মঙ্গলবার থেকে সবচেয়ে ভালো মানের (২২ ক্যারেট) প্রতিভরি সোনা ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি ভরিতে বেড়েছে প্রায় দুই হাজার টাকা। দেশের বাজারে এর আগে কখনই সোনার দাম এত উচ্চতায় উঠেনি।
বিশ্ববাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের বাজারেও সোনার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে; রেকর্ডের পর রেকর্ড হচ্ছে। এ নিয়ে নতুন বছরের এক মাস ১০ দিনে ছয় দফায় প্রতিভরি সোনার দাম বেড়েছে ১১ হাজার ৫২৬ টাকা।
চার দিন আগে গত ৬ ফেব্রুয়ারি ২২ ক্যারেট মানের সোনার দাম ২ হাজার ৯২৮ টাকা বাড়ানোয় ভরি উঠেছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮১৮ টাকায়। যা ছিল এত দিন সর্বোচ্চ।
সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) আরও ১ হাজার ৯৯৫ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) থেকে ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনা কিনতে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
গত বছরের ৩১ অক্টোবর এই মানের সোনার দাম ১ লাখ ৪৩ হাজার ৪২৪ টাকায় উঠেছিল। এরপর তা নিম্মমূখী হয়; ১ লাখ ৩৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা মধ্যে ওঠানামা করে।
বাজুসের নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের বাজারে এক গ্রাম ২২ ক্যারেট সোনা কিনতে ১২ হাজার ৮৪৪ টাকা লাগছে। ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রামে এক ভরি হিসাবে প্রতিভরি কিনতে লাগছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮১২ টাকা।
২১ ক্যারেটের প্রতিভরি সোনা কিনতে লাগছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ১ টাকা। ১৮ ক্যারেটে খরচ হচ্ছে ১ লাখ ২২ হাজার ৫৭৭ টাকা।
আর সনাতন পদ্ধতির এক ভরি সোনা বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ হাজার ৯১৬ টাকায়।
১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক গ্রাম ২২ ক্যারেট সোনা কিনতে ১২ হাজার ৬৭৩ টাকা লেগেছে। প্রতিভরি কিনতে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮১৮ টাকা।
২১ ক্যারেটের প্রতিভরি সোনা কিনতে লেগেছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৯ টাকা। ১৮ ক্যারেটে লেগেছে ১ লাখ ২০ হাজার ৯৪৪ টাকা।
সনাতন পদ্ধতির এক ভরি সোনা বিক্রি হয়েছে ৯৯ হাজার ৫২৯ টাকায়।
হিসাব বলছে, চার দিনের ব্যবধানে প্রতিভরি ২২ ক্যারেট সোনার দাম বেড়েছে ১ হাজার ৯৯৫ টাকা। ২১ ক্যারেটের দাম বেড়েছে ১ হাজার ৯০১ টাকা। ১৮ ক্যারেটের বেড়েছে ১ হাজার ৬৩২ টাকা।
সনাতন পদ্ধতির প্রতিভরির দাম বেড়েছে ১ হাজার ৩৮৮ টাকা।
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর ২২ ক্যারেট মানের সোনার দাম ভরিতে ১ হাজার ৫০ টাকা কমানো হয়েছিল। ২৩ ডিসেম্বর কমানো হয় ১ হাজার ২৪৮ টাকা।
১৯ ডিসেম্বর ২ হাজার ৮৮ টাকা বাড়ানো হয়েছিল; ১৫ ডিসেম্বর ১ হাজার ৭৭৩ টাকা কমানো হয়েছিল। ১২ ডিসেম্বর বাড়ানো হয় ১ হাজার ৮৭৮ টাকা।
এভাবে উঠানামার মধ্যে দিয়েই শেষ হয়েছিল ২০২৪ সাল। গত বছরে মূল্যবান এই ধাতুর দর ৩৫ বার বেড়েছিল; কমেছিল ২৭ বার।
তবে ২০২৫ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে টানা বেড়েছে। দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারিও সেই বাড়ার মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছে।
সোমবার রাতে বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমানের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সোনার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বলা হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার থেকে নতুন দর কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে বাজুস।
বাজুসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি এক ভরি ২২ ক্যারেট সোনার দাম ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৬৯১ টাকা। মঙ্গলবার থেকে এই সোনা ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯১২ টাকায় বিক্রি হবে।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এক বছরে এই মানের সোনার দাম ভরিতে ৩৯ হাজার ১২১ টাকা বেড়েছে। শতাংশ হিসাবে বেড়েছে ৩৫ দমিক ৩৪ শতাংশ।
বিশ্ববাজারেও রেকর্ডের পর রেকর্ড
এদিকে বিশ্ববাজারেও সোনার দাম রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের এক আউন্স (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) সোনার দাম ২ হাজার ৮০০ ডলার স্পর্শ করে। যা ছিল অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। গত কয়েক দিনে তা টানা বেড়ে সোমবার ২ হাজার ৯০০ ডলারও অতিক্রম করেছে।
চড়তে চড়তে গত বছরের অক্টোবরের শেষের দিকে প্রতিআউন্স সোনার দাম প্রায় ২ হাজার ৮০০ ডলারে উঠে গিয়েছিল। সেই দর কমতে কমতে গত ১৫ নভেম্বর ২ হাজার ৫৫০ ডলারে নেমে এসেছিল।
মাঝে কিছু দিন টানা বেড়ে ২ হাজার ৭০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে সেই সোনার দর ফের নিম্নমূখী হয়। গত মাস খানেক ধরে আবার ঊর্ধ্বমূখী হয়েছে।
১০ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টায় বাজুস যখন দেশের বাজারে সোনার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় তখন বিশ্ববাজারে প্রতিআউন্স সোনার দাম ৪৭ ডলার ২৬ সেন্ট বেড়ে ২ হাজার ৯০৯ ডলার ১৬ সেন্টে উঠেছিল। শতাংশ হিসাবে বেড়েছিল ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
এর আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে বাজুস যখন দেশের বাজারে সোনার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিআউন্স সোনার দাম ছিল ২ হাজার ৮৭৫ ডলার ৯৭ সেন্ট।
এক বছরের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে প্রতিআউন্স সোনার দর ৮৪২ ডলার ৯১ সেন্ট বেড়েছে। শতাংশ হিসাবে বেড়েছে প্রায় ৪২শতাংশ।
তবে বুধবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বিশ্ববাজারে সোনার দাম কিছুটা কমেছে; ২ হাজার ৯০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। রাত পৌনে ১০টায় প্রতিআউন্স সোনার দাম ৯ ডলার ৭৮ সেন্ট বা দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে২ হাজার ৮৯৪ ডলার ৫৩ সেন্টে নেমেছে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ববাজারে প্রতিআউন্স সোনার দাম কমতে কমতে ২ হাজার ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে এখন সোনার দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের পর বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতার কারণে সোনার দাম বাড়ছে।
ক্ষমতায় বসার পরপরই চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নানা কৌশলে পাল্টা জবাবের ঘোষণা দিয়েছে বেইজিংও। পাল্টাপাল্টি এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যুদ্ধ আরও জোরদার হয়েছে।
পাল্টা জবাবের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে বেইজিং। পাশাপাশি আরও কিছু পদক্ষেপ নেবে তারা। ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে এসব পদক্ষেপ কার্যকর হওয়ার কথা।
এর আগে চীন থেকে আমদানি করা সব পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে মঙ্গলবার থেকে তা কার্যকর হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান বাণিজ্য পরিস্থিতির কারণে সোনার দাম বাড়ছে। নিরাপদ বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সোনার চাহিদা বেড়ে গেছে। সে কারণেই দাম বাড়ছে।
কমেন্ট