ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কায় জ্বালানি তেলে বড় দরপতন
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির এই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতির গবেষকরা। এ কারণে আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের চাহিদা কমে যেতে পারে। আর তাতেই ধস নেমেছে এর দরে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলোচিত শুল্কের ধাক্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলে বড় দরপতন হয়েছে।
অপরিশোধিত তেলের বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি কমে ৬১ ডলারে নেমে এসেছে। আর ডব্লিউটিআই ক্রুডের দর ৮ শতাংশ কমে নেমেছে ৬৪ ডলারে।
এই দর চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে এমন দরপতন দেখা গিয়েছিল ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে, করোনাভাইরাস মহামারিকালে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করে যে বাণিজ্য যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছেন, তার ঢেউয়ে টালমাটাল হয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি।
গত বুধবার হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলন করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানিকারক শতাধিক দেশের পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক হার পুনর্নির্ধারণ করে দেন ট্রাম্প। তাতে বাংলাদেশের পণ্যে নতুন করে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ হয়েছে, যা আগে ছিল ১৫ শতাংশ।
এছাড়া চীনের ওপর নতুন করে ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প, যা পূর্বে আরোপিত শুল্কসহ ৫৪ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে।
ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ অন্য দেশের পণ্যের ওপরও সম্পূরক শুল্ক হার পুনর্নির্ধারণ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিক্রিয়ায় শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সব পণ্যের ওপর একগুচ্ছ অতিরিক্ত শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেয় চীন।
চীনের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ১০ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাঁচামালের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করবে।
এরই মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে চীন।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির এই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতির গবেষকরা। এ কারণে আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের চাহিদা কমে যেতে পারে। আর তাতেই ধস নেমেছে এর দরে।
তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক ও সহযোগী দেশগুলো তাদের তেল উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা এখন ৪ লাখ ১১ হাজার ব্যারেল প্রতিদিনের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য রেখেছে।
এর আগে ১ লাখ ৩৫ হাজার ব্যারেল প্রতিদিনের বৃদ্ধির পরিকল্পনা ছিল। এটাও বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দরপতনের একটি কারণ।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলার ৩৮ সেন্ট বা ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমে ৬৪ ডলার ৭৬ সেন্টে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে ইউএস টেক্সাস ইটারমিডিয়েট ক্রুড বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলার ৭০ সেন্ট কমে ৬১ ডলার ২৫ সেন্টে নেমেছে। শতাংশ হিসাবে কমেছে ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ।
এই দাম ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর সবচেয়ে কম।
জ্বালানি তেলের দামের এই দরপতনের বিষয়ে ডেনিশ বিনিয়োগ ব্যাংক স্যাক্সো ব্যাংকের পণ্য কৌশল বিভাগের প্রধান ওলে হ্যানসেন বলেন, “মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে চীনের আক্রমণাত্মক পাল্টা পদক্ষেপ নিশ্চিত করে আমরা একটি বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
“এমন একটি যুদ্ধ যার কোনও বিজয়ী নেই এবং যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অপরিশোধিত তেল এবং পরিশোধিত পণ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের চাহিদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
“আর সে কারণেই তেলের দামের এই পতন।”
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির শুরুতে সারা বিশ্বে যখন লকডাউন চলছিল, তখন জ্বালানি তেলের দাম মাইনাস ৩৭ ডলারে নেমে এসেছিল।
অর্থাৎ এক ব্যারেল তেল কিনলে ক্রেতাকে উল্টো ৩৭ ডলার দিতে হয়। এরপর ওপেক ও রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে তেল সরবরাহ কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধি করে।
সে বছরের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক বাজারে গড়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল ৪২ ডলার। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ছিল ৪৯ ডলার।
এরপর সে বছরের ফেব্রুয়ারিতে গড়ে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছিল ৫৩ ডলার, মার্চে ৬০ ডলার, এপ্রিলে ৬৫ ডলার, মে তে ৬৪ ডলার, জুনে ৬৬ ডলার, জুলাইয়ে ৭৩ ডলার এবং আগস্টে ৭৪ ডলার।
অক্টোবরে সেই দাম ওঠে ৮৫ ডলারে। সে সময় দেশের বাজারেও তেলের দাম বাড়ানো হয়।
এরপর তেলের দাম খানিকটা কমে আসে। তবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার সঙ্গে সঙ্গে তেলের দাম ফের বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
দেশে এপ্রিলে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত
দেশে গত মাস মার্চে যে দামে জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে, এপ্রিল মাসেও তাই থাকবে বলে গত সোমবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক আদেশ বলা হয়।
সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিন ১০৫ টাকা, অকটেন ১২৬ টাকা এবং পেট্রোল ১২২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ওঠানামার সঙ্গে মিল রেখে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। বিশ্ব বাজারে দামের হেরফের না হওয়ায় এপ্রিলে দেশের বাজারেও দর অপরিবর্তিত থাকছে।
কমেন্ট