ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কায় সোনার দরেও ধস

ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কায় সোনার দরেও ধস

ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ঘোষণার আগে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৩ হাজার ৩৭ ডলার থেকে বেড়ে ৩ হাজার ১৬২ ডলার ৬০ সেন্টে উঠে গিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের ধাক্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের পর সোনার দরেও বড় দরপতন হয়েছে। একদিনেই প্রতি আউন্স (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) সোনার দাম ৭০ ডলার কমে গেছে; শতাংশ হিসাবে কমেছে ২ দশমিক ১৫ শতাংশ।

শনিবার বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সোনার দর ছিল ৩ হাজার ৩৭ ডলার ৬৫ সেন্ট।

ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ঘোষণার আগে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৩ হাজার ৩৭ ডলার থেকে বেড়ে ৩ হাজার ১৬২ ডলার ৬০ সেন্টে উঠে গিয়েছিল।

বিশ্ববাজারে সোনার দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বাজারেও কয়েক দফায় দাম বাড়ানো হয়। এতে বর্তমানে দেশের বাজারে ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা।

দেশের বাজারে সর্বশেষ সোনার দাম বাড়ানো হয় ঈদের আগে ২৯ মার্চ।

দেশের বাজারে সোনার দাম নির্ধারণ করে থাকে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। সংগঠনটির নির্ধারণ করে দেওয়া দর অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে ভালো মানের (২২ ক্যারেট) প্রতিভরি সোনা (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) ১ লাখ ৫৭ হাজার ৮৭২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দর বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

২১ ক্যারেটের প্রতিভরি সোনা কিনতে লাগছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৯৯ টাকা। ১৮ ক্যারেটে লাগছে ১ লাখ ২৯ হাজার ১৬৭ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির এক ভরি সোনা বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ৬ হাজার ৫৩৯ টাকায়।

চড়তে চড়তে গত ২১ ফেব্রুয়ারি ২২ ক্যারেট মানের সোনার ভরি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৫২৫ টাকায় উঠেছিল। পরে অবশ্য কয়েক দফায় কমে ভরি দেড় লাখ টাকার নিচে নেমে এসেছিল।

গত ১৬ মার্চ ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ২ হাজার ৬১৩ টাকা বাড়ানো হয়েছিল; ভরি ওঠেছিল ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৭৫ টাকায়। ১৭ মার্চ থেকে কার্যকর হয়েছিল ওই দর।

তার আগে তিন দফায় ৬ হাজার ১৮২ টাকা কমানোর পর গত ৪ মার্চ এক দিনেই ২২ ক্যারেট মানের সোনার দর ভরিতে ৩ হাজার ৫৫৮ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল বাজুস। ৫ মার্চ থেকে ওই দর কার্যকর হয়।

তিন দিনের ব্যবধানে ৮ মার্চ প্রতিভরি সোনার দাম ১ হাজার ৩৮ টাকা কমানো হয়। ৯ মার্চ থেকে ওই দর কার্যকর হয়। ভরি নেমেছিল ১ লাখ ৫০ হাজার ৮৬২ টাকায়। ১ মার্চ ২ হাজার ৬২৪ টাকা কমানোয় ভরি দেড় লাখ টাকার নিচে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩৪৩ টাকায় নেমেছিল।

বিশ্ব বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের বাজারেও সোনার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছিল। রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়েছিল। টানা আট দফায় প্রতিভরি ২২ ক্যারেট সোনার দাম বেড়েছিল ১৬ হাজার ২৩৬ টাকা।

এর পর ছয় দিনের ব্যবধানে তিন দফায় ৬ হাজার ১৮২ টাকা কমে সেই সোনার ভরি দেড় লাখ টাকার নিচে নেমে এসেছিল।

২৯ মার্চ দেশের বাজারে যখন সোনার দাম বাড়ানো হয় তখন বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ৩ হাজার ৮০ ডলার। সেখান থেকে প্রায় ১০০ ডলার বেড়ে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৩ হাজার ১৬২ ডলারে উঠলেও ঈদের ছুটি থাকায় গত কয়েকদিনে দেশের বাজারে সোনার দামে কোনো পরিবর্তন আনেনি বাজুস।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানো হয়েছে। চীনের পণ্য আমদানির ওপর ৩৪ শতাংশ, বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ, ভারতের ওপর ২৬ শতাংশ, জাপানের ওপর ২৪ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের তালিকায় ছিল অস্ট্রেলিয়ার অধীনে থাকা হার্ড ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপ। এই দ্বীপগুলো ভারত মহাসাগরের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত এবং সেখানে পেঙ্গুইন ছাড়া কোনো মানুষ বসবাস করে না।

তবে এবার রাশিয়া, কানাডা, মেক্সিকো, উত্তর কোরিয়া কিংবা কিউবার নাম নেই। 

প্রতিবেশী দুই দেশ কানাডা ও মেক্সিকোর পণ্যের ওপর আগেই ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কানাডার জ্বালানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তির (ইউএসএমসিএ) আওতায় যেসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে, সেগুলো এখনো নতুন শুল্কের আওতামুক্ত রয়েছে। তবে গাড়ির যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য পণ্যের ওপর বৃহস্পতিবার থেকে নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে।

জ্বালানি তেলেও বড় দরপতন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলোচিত শুল্কের ধাক্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দরেও বড় দরপতন হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি কমে ৬১ ডলারে নেমে এসেছে। আর ডব্লিউটিআই ক্রুডের দর ৮ শতাংশ কমে নেমেছে ৬৪ ডলারে।

এই দর চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে এমন দরপতন দেখা গিয়েছিল ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে, করোনাভাইরাস মহামারিকালে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করে যে বাণিজ্য যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছেন, তার ঢেউয়ে টালমাটাল হয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি।

গত বুধবার হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলন করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানিকারক শতাধিক দেশের পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক হার পুনর্নির্ধারণ করে দেন ট্রাম্প। তাতে বাংলাদেশের পণ্যে নতুন করে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ হয়েছে, যা আগে ছিল ১৫ শতাংশ।

এছাড়া চীনের ওপর নতুন করে ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প, যা পূর্বে আরোপিত শুল্কসহ ৫৪ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে।

ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ অন্য দেশের পণ্যের ওপরও সম্পূরক শুল্ক হার পুনর্নির্ধারণ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিক্রিয়ায় শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সব পণ্যের ওপর একগুচ্ছ অতিরিক্ত শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেয় চীন।

চীনের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ১০ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাঁচামালের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করবে।

এরই মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে চীন।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির এই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতির গবেষকরা। এ কারণে আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের চাহিদা কমে যেতে পারে। আর তাতেই ধস নেমেছে এর দরে।

তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক ও সহযোগী দেশগুলো তাদের তেল উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা এখন ৪ লাখ ১১ হাজার ব্যারেল প্রতিদিনের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য রেখেছে।

এর আগে ১ লাখ ৩৫ হাজার ব্যারেল প্রতিদিনের বৃদ্ধির পরিকল্পনা ছিল। এটাও বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দরপতনের একটি কারণ।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলার ৩৮ সেন্ট বা ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমে ৬৪ ডলার ৭৬ সেন্টে নেমে এসেছে।

অন্যদিকে ইউএস টেক্সাস ইটারমিডিয়েট ক্রুড বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলার ৭০ সেন্ট কমে ৬১ ডলার ২৫ সেন্টে নেমেছে। শতাংশ হিসাবে কমেছে ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ।

এই দাম ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর সবচেয়ে কম।

জ্বালানি তেলের দামের এই দরপতনের বিষয়ে ডেনিশ বিনিয়োগ ব্যাংক স্যাক্সো ব্যাংকের পণ্য কৌশল বিভাগের প্রধান ওলে হ্যানসেন বলেন, “মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে চীনের আক্রমণাত্মক পাল্টা পদক্ষেপ নিশ্চিত করে আমরা একটি বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

“এমন একটি যুদ্ধ যার কোনও বিজয়ী নেই এবং যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অপরিশোধিত তেল এবং পরিশোধিত পণ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের চাহিদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

“আর সে কারণেই তেলের দামের এই পতন।”

২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির শুরুতে সারা বিশ্বে যখন লকডাউন চলছিল, তখন জ্বালানি তেলের দাম মাইনাস ৩৭ ডলারে নেমে এসেছিল।

অর্থাৎ এক ব্যারেল তেল কিনলে ক্রেতাকে উল্টো ৩৭ ডলার দিতে হয়। এরপর ওপেক ও রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে তেল সরবরাহ কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধি করে।

সে বছরের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক বাজারে গড়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল ৪২ ডলার। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ছিল ৪৯ ডলার।

এরপর সে বছরের ফেব্রুয়ারিতে গড়ে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছিল ৫৩ ডলার, মার্চে ৬০ ডলার, এপ্রিলে ৬৫ ডলার, মে তে ৬৪ ডলার, জুনে ৬৬ ডলার, জুলাইয়ে ৭৩ ডলার এবং আগস্টে ৭৪ ডলার।

অক্টোবরে সেই দাম ওঠে ৮৫ ডলারে। সে সময় দেশের বাজারেও তেলের দাম বাড়ানো হয়।

এরপর তেলের দাম খানিকটা কমে আসে। তবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার সঙ্গে সঙ্গে তেলের দাম ফের বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।

ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কায় জ্বালানি তেলে বড় দরপতন পরবর্তী

ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কায় জ্বালানি তেলে বড় দরপতন

কমেন্ট