যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের আমদানি শুল্কও ‘পর্যালোচনা’ করছে বাংলাদেশ
ট্রাম্পের শুল্ক ধাক্কায় কি হবে বাংলাদেশের
বুধবার ট্রাম্প হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক হার বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ায় বাংলাদেশের পোশাক শিল্পমালিকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প; সেই ঢেউ এসে লাগবে বাংলাদেশেও। তা সামলাতে এখন বাংলাদেশেরও জোর প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ এসেছে অর্থনীতিবিদের কাছ থেকে।
ট্রাম্প বুধবার হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলন করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানিকারক শতাধিক দেশের পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক হার পুনর্নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তাতে বাংলাদেশের পণ্যে নতুন করে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ হয়েছে। যা এতদিন ছিল ১৫ শতাংশ।
একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। মোট রপ্তানি আয়ের ২০ শতাংশের মতো আসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির এই দেশ থেকে।
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২২ সালে এই বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৩৬ শতাংশ বেড়ে ৯৭৩ কোটি (৯.৭৩ বিলিয়ন) ডলারে উঠেছিল। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে প্রবৃদ্ধি তো দূরের কথা, উল্টো ২৫ শতাংশ কমেছিল।
সেই নেতিবাচক ধারা চলে ২০২৪ সালেও। তবে বছরের শেষ দিকে এসে গতি বাড়ায় শেষ পর্যন্ত নামমাত্র প্রবৃদ্ধি দিয়ে শেষ হয়েছিল বছর। গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৭৩৪ কোটি (৭.৩৪ বিলিয়ন) ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে, যা ছিল ২০২৩ সালের তুলনায় শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি।
সুসংবাদ হচ্ছে নতুন বছর অর্থাৎ ২০২৫ সাল শুরু হয়েছে বড় চমক দিয়ে। এই বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৮০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। এই অঙ্ক গত বছরের জানুয়ারির চেয়ে ৪৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ৫৪ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল দেশটিতে।
প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের ধারেকাছেও ছিল না প্রতিযোগী দেশ চীন, ভিয়েতনাম, ভারতসহ অন্য কোনও দেশ। এরই মধ্যে আরেকটি সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল বাংলাদেশের জন্য।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই কানাডা, মেক্সিকো ও চীন থেকে পণ্য আমদানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করায় বাজারটি নিয়ে নতুন সম্ভাবনা দেখছিলেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা।
বিশেষ করে প্রধান প্রতিযোগী দেশ চীনের বাজার বাংলাদেশের দখলে আসবে বলে আশায় বুক বেধেছিলেন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা।
কিন্তু বুধবার ট্রাম্প হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক হার বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ায় বাংলাদেশের পোশাক শিল্পমালিকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
নতুন ঘোষণায় ১৫ শতাংশ থেকে শুল্ক এক লাফে ৩৭ শতাংশ ওঠায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কি ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, রপ্তানি কতোটা কমবে—তা নিয়েই সবাই চিন্তিত এখন।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত যে বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসছে, তা সহজেই অনুমেয়।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে (ডব্লিউটিও) তোয়াক্কা না করা ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে বিশ্ববাণিজ্যের গতি-প্রকৃতিই পাল্টে যাবে বলে মনে করেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এই অধ্যাপক বৃহস্পতিবার ফেইসবুকে দেওয়া এক ভিডিও পোস্টে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণের পাশাপাশি বাংলাদেশের ওপর তার সম্ভাব্য যে অভিগাত পড়বে তা তুলে ধরেছেন।
সেই সঙ্গে এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের এখন কী করার আছে, তা নিয়েও কিছু পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বিশ্ববাণিজ্যে যে প্রভাব
অধ্যাপক সেলিম রায়হান বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্পের ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ হার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের জন্য যে শুল্ক হার (৩৭%) ঠিক করেছেন ট্রাম্প, ভিয়েতনামের (৪৬%) ওপর তার চেয়ে বেশি হারে বসিয়েছেন, আবার ভারতের (৫২%) ওপর কম হারে বসেছে।
গত জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই চীন, কানাডা, মেক্সিকোর পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। তখনই অন্য দেশগুলোর পণ্যের ক্ষেত্রেও শুল্ক বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি।
সেলিম রায়হান বলেন, “অনেকে ভাবছিলেন, এই রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ শুধু কয়েকটি দেশের ওপর টার্গেট করে করা হবে।
“আমি তখন বলার চেষ্টা করছিলাম যে ইউএসের সঙ্গে যাদের বাণিজ্য ঘাটতি আছে, ট্রাম্প অ্যাডমিনিস্টেশন তাদের সবাইকে টার্গেট করবে। তাই ঘটেছে। শুধু তাই নয়, ঘাটতির বাইরেও যে দেশগুলো আছে, তাদের ওপরও সমান হারে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।”
ব্যবসায়ী ট্রাম্প এক্ষেত্রে যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতিগুলোর কোনও পরোয়া করছেন না, তা তুলে ধরে সামনের দিনগুলো আরও কঠিন হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন সেলিম রায়হান।
তিনি বলেন, “আন্তর্জতিক বাণিজ্যর অনেক রুলস কিন্তু ডব্লিওটিএর মাধ্যমে ফলো করা হয়। এর মধ্যে আছে ‘মোস্ট ফেভারড নেশন-এমএফএন প্রিন্সিপাল। কারও ওপর বা কোনও দেশ অন্য দেশের ওপর ইচ্ছামতো ট্যারিফ আরোপ করতে পারে না।
“কিন্তু এখানে আমি দেখছি, ঘটনাটি একেবারে ভিন্ন। এমএফএন প্রিন্সিপালের বড় ধরনের ভায়োলেশন হচ্ছে। এখানে আমরা ডব্লিউটিওর ক্ষমতা সেভাবে দেখছি না। এর মধ্যদিয়ে ডব্লিউটিওর অক্ষমতা প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে।”
এতে বাংলাদেশের সঙ্কটের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, “যার অর্থ হচ্ছে, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো, এমনকি উন্নত দেশগুলোকেও নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে যে বৈশ্বিক যে বাণিজ্য কাঠামো বা ব্যবস্থা, তা কীভাবে সংস্কার করা দরকার।”
“এটা এখন বোঝাই যাচ্ছে, ডব্লিউটিওর ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের আস্থা নেই এবং এরপর কিন্তু নানা ধরনের ইমপ্লিকেশন আমরা দেখতে পাব। এই অবস্থায় কোনও দেশের ডব্লিওটিএর কাছে গিয়ে প্রতিকার পাওয়ার কোনও সুযোগ হয়ত আমরা দেখতে পাব না।”
বাংলাদেশের ওপর কী প্রভাব
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের বড় গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র হওয়ায় ট্রাম্পের নতুন সিদ্ধান্তের বড় প্রভাবই বাংলাদেশের ওপর পড়বে বলে মনে করেন সেলিম রায়হান।
তিনি বলেন, “আমাদের একট বড় বাজার ইউএস এবং সেখানে পোশাক সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করে থাকি। এখন এ অতিরিক্ত শুল্ক, তার প্রভাবটা কী হতে পারে, এটা কিন্তু আমাদের দেখতে হবে।”
বিভিন্ন দেশের ওপর বিভিন্ন হারে শুল্ক আরোপ হওয়ায় কার ওপর কতটুকু আরোপ হয়েছে, কার কী ধরনের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে দেখার পরামর্শ দেন তিনি।
সেলিম রায়হান বলেন, “কমন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি যে একটা অনিশ্চয়তাময় বাণিজ্যিক ব্যবস্থা শুরু হতে যাচ্ছে, সেটা কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সহায়ক নয়।
“এখন যে কোনও দেশ ইউএসের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অন্য দেশগুলোর ওপর ট্যাক্স ইমপোজ করতে পারে। ডব্লিউটিওর কাছে গিয়েও প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।”
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি কমবেই- এই ধারণা দিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের গার্মেন্ট রপ্তানি ইউএসের বাজারে বড় ধাক্কা খাওয়ার ঝুঁকি আছে। ইউএসের বাজারে রপ্তানি কমে যাবে, তা তো প্রেডিক্ট করতেই পারি। সেখানে অন্যান্য পণ্যও রপ্তানি করি, লেদার, ওষুধ ইত্যাদি, সেখানেও ধাক্কা খেতে পারি।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বিদেশে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশের মোট আয় আসে ৪৪ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৮১ দশমিক ২৪ শতাংশই আসে পোশাক খাত থেকে। পোশাক খাতের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
মাঝে কমে গেলেও গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৮০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছিল।
ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসেই চীনের পণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপের পর বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা বেশ আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন, এখন তাতে গুঁড়ে বালি পড়ল।
বাংলাদেশ এখন করবে কী
জানুয়ারিতে ট্রাম্প যখন বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তখন ভারতসহ অন্যান্য দেশ প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেও বাংলাদেশে তা হয়নি বলে হতাশা প্রকাশ করেন সেলিম রায়হান।
তিনি বলেন, “যখনই এই ট্যারিফের কথা এনেছিল ট্রাম্প, তখন দেশগুলো প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে। কিন্তু বাংলাদেশে পলিসি মেকাররা মনে হয় একটা কমফোর্ট জোনে ছিল। শুল্ক বিভাগ, তারা এটা নিয়ে তারা ভেবেছে কি, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।”
এখন বাংলাদেশের যে পথ ধরতে হবে, তার মধ্যে প্রধান হিসাবে আমদানি শুল্ক হার পুনঃমূল্যায়নের কথা বলেন সেলিম রায়হান।
“আমাদের শুল্ক কাঠামোর দিকে যদি আমরা তাকাই, তবে দেখতে পাব উচ্চ শুল্ক হার যাদের রয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। তার মধ্যে আমাদের কাস্টমস ডিউটির পাশাপাশি প্যারা ট্যারিফ রয়েছে, সেগুলো কিতু বেশ উচ্চ। এগুলো নিয়ে আমাদের অংশীদার বিভিন্ন দেশ কিন্তু নানা সময়ে অভিযোগ করে গেছে।”
“এটা কিন্তু ডব্লিউটিওর নীতির সঙ্গে যায় না। আমরা এলডিসি হিসাবে নানা সময়ে পার পেয়ে গেছি ডব্লিউটিওর চাপ থেকে। এখন কিন্তু চাপ এড়ানোর সুযোগ নেই,” বলেন তিনি।
এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরকে দায়িত্ব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে, অংশীদারদের সঙ্গে, গবেষকদের সঙ্গে আলোচনা করে আমদানি শুল্ক হার পুনর্বিন্যাস করতে হবে বলে মনে করেন সেলিম রায়হান।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এরই মধ্যে জানিয়েছেন, এবিষয়ে কাজ শুরু করেছে এনবিআর।
বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নানা পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন সেলিম রায়হান।
তিনি বলেন, “আমাদের অবশ্যই ইউএস পলিসি মেকারদের সঙ্গে এঙ্গেজ হতে হবে, শুধু বাণিজ্যের জায়গায় নয়, ডিপ্লোমেটিক লেভেলেও এঙ্গেজ হওয়া দরকার। রেসিপ্রোকাল ক্যালকুলেশনে যে ধোঁয়াশা আছে, তা নিয়ে কথা তুলতে হবে।”
বিশ্ব বাজার সামনে আরও কঠিন হওয়ার ধারণা দিয়ে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তৈরির ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন সেলিম রায়হান।
তিনি বলেন, “আমাদের অতিনির্ভরতা গার্মেন্টের ওপর, এটা আমাদের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্য যে রপ্তানি খাতগুলো আছে, সেগুলোতে জোর দিতে হবে।”
প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর কোনও উদ্যোগ রাজনৈতিক সরকার আমলে না দেখার পর এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও না দেখার কথা বলেন সেলিম রায়হান।
অন্যান্য শিল্প খাতের বিকাশে কী কী অন্তরায় আছে, তা কীভাবে কাটিয়ে তোলা যায়, তার একটি ‘রোডম্যাপ’ তৈরির পরামর্শ দেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রতিযোগী অন্য দেশগুলোকে দেখিয়ে সেলিম রায়হান বলেন, “সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরতা কাটাতে হবে। ভিয়েতনাম, ক্যাম্বোডিয়া, লাওস, এমনকি ভারতও সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরশীল নয়, তারা দক্ষ শ্রমিক তৈরি করেছে।”
দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের পথ তৈরির পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “তারা (প্রতিযোগী দেশগুলো) কিন্তু বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করেছে। ভিয়েতনামের ৫০টা এফটিএ আছে, অথচ বাংলাদেশের আছে শুধু একটা, ভুটানের সঙ্গে। এই রকম অবস্থায় প্রতিযোগিতায় সক্ষম দেশগুলো কিন্তু এগিয়ে থাকবে।”
বাংলাদেশের সামনে এখন অনেক কাজ রয়েছে জানিয়ে তার কয়েকটি চিহ্নিত করে দেন সেলিম রায়হান। তার মধ্যে রয়েছে- নীতি সংস্কার, অবকঠামো উন্নয়ন, আমদানি শুল্ক কমানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ।
“দীর্ঘদিনের জমে থাকা কাজ, যা আমরা করিনি, তা এখন স্বল্প সময়ে করার চাপ তৈরি হয়েছে। সামনের দিনে আরও বিরূপ পরিবেশ আসবে, তার জন্য কিন্তু সক্ষমতা বাড়াতে হবে,” বলেন তিনি।
আগে যা বলেছিলেন সেলিম রায়হান
গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত এক কলামে ট্রাম্পের পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশের কয়েকটি ঝুঁকির কথা বলেছিলেন সেলিম রায়হান। ফেইসবুকে তাও তুলে ধরেছেন তিনি।
তিনি লিখেছিলেন, এই প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারকদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করা জরুরি বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। সেগুলো হলো-
প্রথমত, সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি মূল্যায়ন: সম্ভাব্য শুল্ক বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট প্রভাব চিহ্নিত করার জন্য একটি তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ জরুরি। ৬ ডিজিট হারমোনাইজড সিস্টেম কোড অনুযায়ী দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বিশদ বিশ্লেষণ করলে কোন পণ্য বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তা বোঝা যাবে। ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের যৌথভাবে বিকল্প বাজার অনুসন্ধান এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ বিষয়ে শিল্প সংস্থা ও বাণিজ্যবিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিক সংলাপ: যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক, বাণিজ্য প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সক্রিয় ও অর্থবহ সংলাপ অপরিহার্য। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের মিশন এবং ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে, যাতে কোনো প্রতিকূল বাণিজ্যব্যবস্থা আগেভাগেই প্রতিহত করা যায়। এ ছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও আঞ্চলিক জোটগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশকে তার স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করতে হবে।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক ঝুঁকি সামলানোর ক্ষমতা বৃদ্ধি: কর, বাণিজ্যনীতি ও শিল্পকৌশলের ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ জরুরি। উচ্চমূল্য সংযোজিত উৎপাদন ও সেবা খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং বাণিজ্যিক অবকাঠামো উন্নত করার দিকেও জোর দিতে হবে।
কমেন্ট