জরুরি বৈঠক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি বাড়ানো হবে
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস শনিবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের বিষয়ে উপদেষ্টা ও শীর্ষ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ছবি: পিআইডি
বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প; সেই ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশেও। তা সামলাতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জরুরি বৈঠক করেছেন।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করবেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। অন্যদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার পদক্ষেপ নেবে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি বাড়ানোর মাধ্যমে এই ঘাটতি কমানো হবে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশি পণ্যের ওপরও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য শনিবার সন্ধ্যায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বৈঠকটি হয়।
বৈঠক শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কের চাপ থেকে রেহাই পেতে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। এ বিষয়ে তিনি (মুহাম্মদ ইউনূস) যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন।”
একই সঙ্গে সামষ্টিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ‘যা ভালো’ সেগুলো সমন্বয় করে আমদানি করার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এক প্রশ্নের উত্তরে বাণিজ্য উপদেষ্টা বশিরউদ্দীন বলেন, ''আমরা বাণিজ্য ঘাটতি কমাব। সেটার জন্য একটা রাস্তা হচ্ছে আমদানি বৃদ্ধি। আমাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যই আমরা আমদানি বৃদ্ধি করব।''
শুল্ক পরবর্তী করণীয় বোঝার চেষ্টার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের বিপরীতে বাংলাদেশের জন্য কোনো সম্ভাবনা রয়েছে কি না সেটিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলেও জানান বাণিজ্য উপদেষ্টা।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
শেখ বশির বলেন, ''আমাদের প্রধান উপদেষ্টা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। যেহেতু আমাদের নিশ্চিতভাবে সবচাইতে বড় সম্পদ প্রধান উপদেষ্টা মহোদয়। উনার যে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা সেটাকে আমরা ব্যবহার করে আমরা যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সাথে আমরা যোগাযোগ করব।''
বাংলাদেশি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসানোর প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এ জরুরি বৈঠক ডাকেন। এতে সরকারের উপদেষ্টা, সরকারি কর্মকর্তারাসহ অর্থনীতিবিদরা অংশ নেন।
প্রায় দুই ঘণ্টার বৈঠক শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা ফেব্রুয়ারিতে প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের তথ্য তুলে ধরে বলেন, তিনি মার্কিন শুল্ক বিভাগের সঙ্গে আলোচনায় বসে বাণিজ্য বাড়ানো নিয়ে আলোচনা করেন।
”আমাদের আগ্রহ যে বাণিজ্য বৃদ্ধি কল্পে আমাদের কর্মসমষ্টি নির্দিষ্ট করেন। এবং তার পরিপ্রেক্ষিতেই আজকে যে আমেরিকা থেকে যে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে দুনিয়াব্যাপী, একটা বেজলাইন ট্যারিফ দেওয়া হয়েছে ১০ পার্সেন্ট এবং এর সাথে দেশভিত্তিক বাণিজ্যের যে ঘাটতি, এই ঘাটতির উপরে একটা হিসাব করে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রূপে শুল্ক আরোপ করেছে।
আমাদের উপরে আরোপিত শুল্ক এবং আমাদের বাণিজ্যের যে ধরণ এবং বাণিজ্যের যে গঠন, এটার উপর ভিত্তি করে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনায় এবং প্রধান উপদেষ্টা নিজেই যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে সংযুক্ত হবেন এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান তুলে ধরার জন্য।”
বাংলাদেশের সম্ভাবনার বিষয়টি তুলে ধরতে গিয়ে শেখ বশির বলেন, “সম্ভাবনার বিপরীত যে বিষয়গুলো রয়েছে, আমরা সে বিষয়গুলোকে সাম্যকভাবে উপলব্ধি করে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে এনে আশা করছি যে তুলনামূলকভাবে আমরা আমাদের প্রতিযোগী দেশের থেকে ভালো অবস্থানে যাওয়ার প্রচেষ্টায় রত আছি।”
দুই পক্ষের স্বার্থ ঠিক রেখে কীভাবে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ''আমদানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যেতে পারে। সয়াবিন তেল, পোশাক শিল্পের জন্য তুলা, মেটাল স্ক্র্যাপ আমদানি করি যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এছাড়া শিল্প যন্ত্রাংশ, জ্বালানি পণ্য আমদানি করি। জ্বালানি পণ্য আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে করি। সামষ্টিকভাবে আমাদের অর্থনীতির জন্য যা ভালো সেগুলো সমন্বয় করে আমদানি করব।”
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেনটেটিভ খলিলুর রহমান, বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী ও মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন মিয়া, এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান, বিডার নির্বাহী আশিক চৌধুরী, অর্থ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের শতাধিক দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় ৩৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্কের মুখোমুখি হবে।
এতদিন বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ, যা এখন বেড়ে হল মোট ৫২ শতাংশ।
একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। মোট রপ্তানি আয়ের ২০ শতাংশের মতো আসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির এই দেশটি থেকে।
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২২ সালে এই বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৩৬ শতাংশ বেড়ে ৯৭৩ কোটি (৯.৭৩ বিলিয়ন) ডলারে উঠেছিল। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে প্রবৃদ্ধি তো দূরের কথা, উল্টো ২৫ শতাংশ কমেছিল।
সেই নেতিবাচক ধারা চলে ২০২৪ সালেও। তবে বছরের শেষ দিকে এসে গতি বাড়ায় শেষ পর্যন্ত নামমাত্র প্রবৃদ্ধি দিয়ে শেষ হয়েছিল বছর। গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৭৩৪ কোটি (৭.৩৪ বিলিয়ন) ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে, যা ছিল ২০২৩ সালের তুলনায় শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি।
সুখবর হচ্ছে নতুন বছর অর্থাৎ ২০২৫ সাল শুরু হয়েছিল বড় চমক দিয়ে। এই বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৮০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। এই অঙ্ক গত বছরের জানুয়ারির চেয়ে ৪৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ৫৪ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল দেশটিতে।
প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের ধারেকাছেও ছিল না প্রতিযোগী দেশ চীন, ভিয়েতনাম, ভারতসহ অন্য কোনও দেশ। এরই মধ্যে আরেকটি সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল বাংলাদেশের জন্য।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই কানাডা, মেক্সিকো ও চীন থেকে পণ্য আমদানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করায় বাজারটি নিয়ে নতুন সম্ভাবনা দেখছিলেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা।
বিশেষ করে প্রধান প্রতিযোগী দেশ চীনের বাজার বাংলাদেশের দখলে আসবে বলে আশায় বুক বেধেছিলেন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা।
কিন্তু গত ২ এপ্রিল (বুধবার) ট্রাম্প হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক হার বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ায় বাংলাদেশের পোশাক শিল্পমালিকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীন ও ভিয়েতনামের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। তার ঠিক একধাপ নিচে অর্থাৎ চতুর্থ স্থানে রয়েছে ভারত।
গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৭৩৪ কোটি (৭.৩৪ বিলিয়ন) ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। একই বাজারে ভারতের রপ্তানি ছিল ৪৬৯ কোটি (৪.৬৯ বিলিয়ন) ডলার। গত বছর ভারতের রপ্তানি তার আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ বেশি হয়েছিল।
ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যে সম্পূরক শুল্ক বসিয়েছেন ২৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে যে তিনি খাতির করেছেন, তাও অকপটে জানিয়েছেন।
ট্রাম্প বলেছেন, “নরেন্দ্র মোদী আমার বন্ধু। সবে তিনি আমেরিকা থেকে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু আমি তাকে বলেছি, আপনি আমার খুবই ভালো বন্ধু হতে পারেন, কিন্তু আপনি আমাদের সঙ্গে ঠিক ব্যবহার করছেন না। ভারত আমাদের পণ্যে ৫২ শতাংশ শুল্ক বসায়, আমরা ২৬ শতাংশ বসালাম।”
ভারতের পণ্যের ওপর আগে যুক্তরাষ্ট্রে আড়াই শতাংশ শুল্ক বসানো ছিল। এখন তার সঙ্গে ২৬ শতাংশ যোগ হলে সব মিলিয়ে দাঁড়াবে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আগেই শুল্ক ছিল ১৫ শতাংশ; তার সঙ্গে এখন ট্রাম্প যোগ করলেন ৩৭ শতাংশ। ফলে দুই মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য ঢোকাতে ৫২ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। অর্থাৎ ১০০ ডলারের পণ্য রপ্তানি করলে ৫২ ডলার শুল্ক দিতে হবে।
আর এতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কি ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, রপ্তানি কতোটা কমবে—তা নিয়েই চিন্তিত এখন পোশাক রপ্তানিকারকরা।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত যে বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসছে, তা সহজেই অনুমেয়।
ব্যবসায়ীদের এ নিয়ে আতঙ্কের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ''আমাদের ধারণা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হব না। কারণ আমাদের প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, চীন, কম্বোডিয়ার শুল্ক বেশি। আমাদের চেয়ে কম শুল্ক ভারত ও পাকিস্তানের থাকলেও আমাদের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য তাদের থেকে অনেক বেশি বহুমুখী। আমাদের শিল্পের যে অবয়ব দেশ দুটো থেকে অনেক বেশি পরিপক্ষ।”
“তাই আমরা মনে এটি আরও সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।''
শুল্ক নিয়ে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। বাংলাদেশের পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ''গত ফেব্রুয়ারি থেকে প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেনটেটিভ যোগাযোগ শুরু করেছেন। আমরা তাদের সঙ্গে শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নয়, চাই বাণিজ্য বৃদ্ধি করতে। সে জন্য করণীয় ঠিক করতে বিভিন্ন কার্যক্রমের পাশাপাশি তুলা আমদানির জন্য আমদানি নীতি সংশোধন করেছি।''
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি পণ্যে আরোপিত শুল্ক ৩ শতাংশের কম থাকার তথ্য দিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, “৭৪ শতাংশ আমদানি শুল্কের তথ্যটা সঠিক নয়।”
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, ''ইউএসটিআর প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশে তিনটা বিষয় উল্লেখ করে—কাস্টম অ্যান্ড ডিউটি; ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি এনফোরসমেন্ট; সহজে ব্যবসা পদ্ধতি। আমাদের সংস্কার এজেন্ডার সঙ্গে এগুলো মিলে যায়। তাই আমরা তাদের কাছে যে বার্তাটা নিয়ে যাচ্ছি সেখানে বিষয়টি উল্লেখ থাকবে।''
আরেক প্রশ্নের জবাবে শেখ বশির বলেন, ''বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাদের যে তিনটা মূল্যায়ন সেগুলো আমাদের সংস্কারের কাজের সাথে একত্রিত হয়েছে। আমাদেরও উদ্দেশ্য এবং তাদের আকাঙ্ক্ষাগুলোকে সমন্বয় করলে বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা মনে করি।”
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান বলেন, “এটা আমাদের জন্য আকস্মিক কোনো বিষয় না। ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে বৈঠক করতে বলেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। সেই সূত্রে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র দপ্তরের অনেকের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তখন থেকে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ক্রমাগত এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।”
“সুতরাং ব্যাপারটা আকস্মিক নয়, আমরা এর জন্য প্রস্তুত। শিগগিরই আমরা একটা ব্যবস্থা নেব এবং সেটা মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেই নেব।”
ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়া যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা দৃশ্যমান, বাংলাদেশের তেমন পদক্ষেপ নেই কেন— এমন প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, “সবকিছু জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত নয়। তাহলে প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছে বিপদে পড়ে যাব।”
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ব্রিফিংয়ে বলেন, “বিডায় প্রায় চার ঘণ্টার বৈঠক করেছি। সবার মতামত নেওয়া হয়েছে। সব দিক থেকে বিশ্লেষণ করে আমরা একটা সিদ্ধান্তে আসব। শুল্ক কার্যকর হবে ৯ এপ্রিল। সুতরাং সময় আছে।”
অন্যরা কী করেছে
যুক্তরাষ্ট্রের এমন শুল্ক আরোপের ঘটনায় বিভিন্ন দেশ ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারও বসে নেই। শনিবারের বৈঠকের পর করণীয় নির্ধারণে রবিবার বিকেলে সচিবালয়ে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক ডেকেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। সকালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অনলাইনে বৈঠক করবেন বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর দেশের রপ্তানিকারকেরা নড়েচড়ে বসেছেন। ট্রাম্পের আরোপ করা পাল্টা শুল্ক কমাতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করার পাশাপাশি প্রয়োজনে লবিস্ট নিয়োগ ও নেটওয়ার্ক বাড়ানোর প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের মধ্যে যেসব পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করার দাবিও জানান তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের বিষয়টি কিছু কিছু দেশ আগেই ধারণা করতে পেরেছিল। এ কারণে এসব দেশ আগে থেকে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ আগাম কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
পাল্টা শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। ফলে দেশটির ক্রেতাদের পক্ষ থেকে ক্রয়াদেশ কমবে বাংলাদেশি পণ্যের। এতে বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চীন ইতিমধ্যে ট্রাম্পের বাড়তি শুল্ক ঘোষণার পর গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত ৩৪ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে চীন।
কমেন্ট