আইএমএফ মিশন ঢাকায়, মিলবে কি দুই কিস্তির ঋণ
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সংকট আরও বেড়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয় বাড়লেও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ বাড়ছে না। এখন দুই কিস্তির (চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি) অর্থ একসঙ্গে পেতে জোর তৎপরতা শুরু করেছে সরকার।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আলোচিত ৪৭০ কোটি (৪.৭ বিলিয়ন) ডলার ঋণের চতুর্থ কিস্তির ৬৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার পাওয়ার কথা ছিল গত ফেব্রুয়ারিতে। পরে তা পিছিয়ে মার্চ মাসে ছাড় করা হবে বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি; সেটাও হয়নি।
এরই মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সংকট আরও বেড়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয় বাড়লেও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ বাড়ছে না। এখন দুই কিস্তির (চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি) অর্থ একসঙ্গে পেতে জোর তৎপরতা শুরু করেছে সরকার।
আর এ নিয়ে আলোচনা করতে আইএমএফের একটি মিশন শনিবার ঢাকায় এসেছে; থাকবে দুই সপ্তাহ। ঢাকা সফরকালে আইএমএফ কর্মকর্তারা অর্থ উপদেষ্টা সালেহ উদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে বৈঠক করবেন। অর্থ মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গেও বৈঠক করবেন তারা।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ আট মাস হতে চলেছে; এই সময়ে আইএমএফের কোনও ঋণ পায়নি বাংলাদেশ।
আইএমএফ তৃতীয় কিস্তির ১১৫ কোটি (১.১৫ বিলিয়ন) ডলার ছাড় করেছিল গত বছরের জুনে।
শর্ত পূরণ না হওয়ায় আইএমএফ চতুর্থ কিস্তির অর্থ ছাড় করেনি। এ দফায় তা থেকে উত্তরণ ঘটতে পারে। এ জন্য ভর্তুকি কমানো, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো, মুদ্রা বিনিময় হার বাজারের পর ছেড়ে দেওয়ার মতো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাংলাদেশকে।
তবে শর্ত পূরণে বাংলাদেশ ও আইএমএফ যদি নিজ নিজ অবস্থানে অনমনীয় থাকে, তাহলে আর কোনও কিস্তি নাও মিলতে পারে। তখন বাংলাদেশের জন্য দেখা দেবে নতুন জটিলতা। অন্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোও তখন বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে রক্ষণশীল হয়ে যেতে পারে। অর্থ উপদেষ্টা সালেহ উদ্দিন আহমেদ নিজেও এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
এই নিরাশার মধ্যে বাংলাদেশ আগামী জুন মাসে চতুর্থের সঙ্গে পঞ্চম কিস্তি পাওয়ার আশাও করছে।
এদিকে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প; সেই ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশেও। এর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমে যাবে; চাপের মধ্যে থাকা বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ আরও কমে যাবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা।
কঠিন এই সময়ে পরিস্থিতি সামলাতে এখনই বাংলাদেশের জোর প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ এসেছে অর্থনীতিবিদের কাছ থেকে। করণীয় নির্ধারণে শনিবার সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠকে বসেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
বৈঠকে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেনটেটিভ খলিলুর রহমান, বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী ও মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন মিয়া, এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান, বিডার নির্বাহী আশিক চৌধুরী, অর্থ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার উপস্থিত ছিলেন।
প্রায় দুই ঘণ্টার বৈঠক শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কের চাপ থেকে রেহাই পেতে প্রধান উপদেষ্টা নিজেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
একই সঙ্গে সামষ্টিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ‘যা ভালো’ সেগুলো সমন্বয় করে আমদানি করার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ''আমরা বাণিজ্য ঘাটতি কমাব। সেটার জন্য একটা রাস্তা হচ্ছে আমদানি বৃদ্ধি। আমাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যই আমরা আমদানি বৃদ্ধি করব।''
শুল্ক পরবর্তী করণীয় বোঝার চেষ্টার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের বিপরীতে বাংলাদেশের জন্য কোনো সম্ভাবনা রয়েছে কি না সেটিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানান বাণিজ্য উপদেষ্টা বশিরউদ্দীন।
এমন অবস্থায় ঋণের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অর্থ ছাড়ের আগে বিভিন্ন শর্ত পালনের অগ্রগতি পর্যালোচনায় আইএমএফের একটি মিশন শনিবার ঢাকা এসেছে। দলটি রবিবার থেকে টানা দুই সপ্তাহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই সফরে আইএমএফের দলটির সঙ্গে অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
বৈঠক শেষে ১৭ এপ্রিল প্রেস ব্রিফিং করবে সফররত আইএমএফের দল। দলটি প্রথম দিন ৬ এপ্রিল (রবিবার) এবং শেষ দিন ১৭ এপ্রিল বৈঠক করবে অর্থ উপদেষ্টা সালেহ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে।
অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক শেষে তাকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করবে আইএমএফ প্রতিনিধি দল। সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি কবে ছাড় করা হবে; আদৌ ছাড় করা হবে কি না- তা বিস্তারিত জানাবেন আইএমএফ দলের প্রতিনিধিরা।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এআরএইচ ডট নিউজকে বলেন, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি থেকে দুই কিস্তির অর্থ একসঙ্গে পেতে বাংলাদেশের সামনে মোটাদাগে তিনটি বাধা রয়েছে। এসব বাধা অতিক্রম করতে না পারলে আইএমএফের কিস্তি পাওয়া কঠিন হবে।
“এগুলো হলো মুদ্রা বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়তি রাজস্ব আদায় ও এনবিআরের রাজস্ব নীতি থেকে রাজস্ব প্রশাসনকে আলাদা করা।”
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আইএমএফকে জানানো হয়েছে, এসব শর্ত বাস্তবায়ন করা হবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজস্ব নীতি থেকে রাজস্ব প্রশাসনকে আলাদা করার পদক্ষেপ ছাড়া বাকি দুটির বিষয়ে তেমন অগ্রগতি নেই।
আগামী জুনের মধ্যে বাজারভিত্তিক মুদ্রা বিনিময় হার বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি এক প্রাক্-বাজেট আলোচনায় বলেন, “তা এখন বলব না। কারণ, মূল্যস্ফীতি আরও কত দিন থাকে, দেখতে হবে। হঠাৎ বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ায় পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো হয়ে গেলে তো বিপদ বাড়বে।”
বর্তমানে ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে বিনিময় হার নির্ধারণ করা হচ্ছে। যার কারণে হঠাৎ ডলারের দাম খুব বেশি বেড়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ পদ্ধতিতে ডলারের দাম বেশ কিছুদিন ধরে ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে।
২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি ঋণ কর্মসূচি চালু হওয়ার পর আইএমএফ থেকে তিন কিস্তিতে ২৩১ কোটি ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। বাকি আছে ঋণের ২৩৯ কোটি ডলার। বিপত্তি দেখা দেয় চতুর্থ কিস্তির অর্থ ছাড়ের আগে। সরকার যদিও আশা করছে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অর্থ একসঙ্গে পাওয়া যাবে আগামী জুনে।
সম্প্রতি অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইআরএফের সঙ্গে এক প্রাক্-বাজেট আলোচনায় অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাজেট সহায়তার জন্যই আইএমএফ ঋণ লাগবে। এ কারণেই বাংলাদেশ সরকার ও আইএমএফ যৌথভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত দুটি কিস্তি একসঙ্গে ছাড়ের বিষয়ে সম্মত হয়।
জাহিদ হোসেন বলেন, “মোটাদাগে তিন বাধা না ছুটলে আইএমএফের ঋণের কিস্তির ভবিষ্যৎ কী হবে, বলা যাচ্ছে না। আইএমএফ চায় বাংলাদেশ বিদ্যমান ক্রলিং পেগ থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যাবে। অর্থ উপদেষ্টা বলছেন- বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থা হতে পারে।
“কিন্তু আমার প্রশ্ন, প্রবাসী আয় রেকর্ড হয়েছে। রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধিও ভালো। এখন যদি বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া না হয়, তবে কখন দেওয়া হবে?”
জাহিদ হোসেন আরও বলেন, “এখন পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। অন্তত ৫৭ হাজার কোটি টাকা বাড়তি আদায় করতে হবে। কিন্তু রাজস্ব আদায় বাড়াতে উদ্যোগ কম। তবে আইএমএফের শর্ত মানতে এনবিআরের নীতি ও প্রশাসন বিভাগ আলাদা হতে যাচ্ছে, তা বলা যায়।
“এ ছাড়া কর অব্যাহতি কমানো হবে বলে বলা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা কিন্তু কর অব্যাহতির বিরুদ্ধে এককাট্টা, এটাও সরকারকে মাথায় রাখতে হবে।”
ভর্তুকি কমানোর অংশ হিসেবে আইএমএফ বিদ্যুতের দাম বাড়াতে বলতে পারে এবং এটিকে সংস্থাটির বাড়াবাড়ি বলেও মনে করেন জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। তবে ভরসা পাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। বিদ্যুতের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে যেতে পারে। তাই সরকারের ভেবেচিন্তেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর আইএমএফেরও উচিত বাংলাদেশের বাস্তবতা বোঝা।
“আমি মনে করি, উভয় পক্ষকে ছাড় দিয়ে হলেও ঋণ কর্মসূচিটি বজায় রাখা দরকার।”
বিদেশি মুদ্রার সরবরাহ বা রিজার্ভ সঙ্কটের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার আইএমএফের কাছে ঋণ চায়। কয়েক দফা আলোচনা শেষে ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করে ওয়াশিংটনভিত্তিক আর্থিক সংস্থাটি।
এরপর এই ঋণের তিন কিস্তির অর্থও পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আইএমএফের কাছ থেকে প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার পায় বাংলাদেশ। ওই বছরের ডিসেম্বরে পায় দ্বিতীয় কিস্তির ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। আর গত বছরের জুনে তৃতীয় কিস্তির ১১৫ কোটি (১.১৫ বিলিয়ন) ডলার পেয়েছে।
তিন কিস্তিতে আইএমএফের কাছ থেকে প্রায় ২৩১ কোটি (২.৩১ বিলিয়ন) ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। ঋণের বাকি ২৩৯ কোটি (২.৩৯ বিলিয়ন) ডলার পাওয়ার কথা চার কিস্তিতে।
ট্রাম্প শুল্কে রিজার্ভ আরও কমার শঙ্কা
রোজা ও ঈদ সামনে রেখে রেমিটেন্স বাড়ায় রিজার্ভ খানিকটা বেড়েছে; ফের ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
ঈদের ছুদির আগে ২৫ মার্চ বিপিএম-৬ হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার; গ্রস হিসাবে ছিল ২৫ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার।
গত ১০ মার্চ এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন) হিসাবে রিজার্ভ ১৯ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে; গ্রস হিসাবে নামে ২৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে।
আকুর বিল শোধের আগে বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার; গ্রস হিসাবে ছিল ২৬ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক বিপিএম-৬ হিসাবের রিজার্ভকে তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসেবে দাবি করে।
সবশেষ গত জানুয়ারি মাসের আমদানির তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, ওই মাসে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ৬ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। সে হিসাবে বর্তমানের ২০ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দিয়ে তিন মাসের কিছু বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে।
রিজার্ভের প্রধান দুই উৎস প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয়। ট্রাম্পের শুল্কের ধাক্কায় রপ্তানি আয় কমে গেলে রিজার্ভ আরও কমে যাবে। তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও সংকটের মধ্যে পড়বে বলে মনে করছেন জাহিদ হোসেন।
ট্রাম্প শুল্কে বিপদে বাংলাদেশ, সুবিধা ভারতের
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক; দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। আর এই পণ্যের বড় গন্তব্য হলো যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক হার বাংলাদেশের জন্য মাথাব্যথার কারণ হওয়াটা স্বাভাবিকই।
কিন্তু সেই মাথাব্যথাটা আরও বাড়ে, যখন সেই বাজারে বাংলাদেশের অন্য প্রতিযোগীদের ওপর শুল্ক হারে বিভিন্নতা থাকে।
যদি বাংলাদেশের চেয়ে শুল্ক হার বেশি হয়, তাহলে নতুন সুযোগ তৈরি হয়। যেমন চীনের ওপর বেশি শুল্ক ধার্য করায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা খুশি হয়েছিলেন গত জানুয়ারিতেই।
চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষ দেশ। তাদের ওপর বাড়তি শুল্কের পর বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানি গিয়েছিল বেড়ে। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা পালে হাওয়া দেখছিলেন।
কিন্তু সেখানে বজ্রাঘাত এল বুধবার; যখন ট্রাম্প শতাধিক দেশের জন্য পাল্টা শুল্ক আরোপ করলেন বিভিন্ন হারে।
তাতে চীনের পাশাপাশি ভিয়েতনামের পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক ধরা হলেও বাংলাদেশের চেয়ে শুল্ক কম ধরা হয়েছে ভারতের। আর এতেই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের শীর্ষ রপ্তানিকারকদের একজন ইভিন্স গ্রুপের কর্ণধার, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ।
কারণ তিনি দেখছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এখন বাংলাদেশকে টপকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে ভারতের।
পারভেজ বলেন, এমনিতেই গত বছর থেকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য বায়ারদের কাছ থেকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছিলেন তারা। এখন যোগ হলো শুল্ক। আর এতে ভারতের সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।
ভারতে রপ্তানিকারকদের সংস্থা ফিকোর মহাপরিচালক অজয় সাহা বলেছেন, “আমরা নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত হব। তবে অন্য অনেক দেশের তুলনায় আমরা কিছুটা ভালো অবস্থায় আছি।”
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীন ও ভিয়েতনামের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। তার ঠিক একধাপ নিচে অর্থাৎ চতুর্থ স্থানে রয়েছে ভারত।
গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৭৩৪ কোটি (৭.৩৪ বিলিয়ন) ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। একই বাজারে ভারতের রপ্তানি ছিল ৪৬৯ কোটি (৪.৬৯ বিলিয়ন) ডলার। গত বছর ভারতের রপ্তানি তার আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ বেশি হয়েছিল।
ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যে সম্পূরক শুল্ক বসিয়েছেন ২৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে যে তিনি খাতির করেছেন, তাও অকপটে জানিয়েছেন।
ট্রাম্প বলেছেন, “নরেন্দ্র মোদী আমার বন্ধু। সবে তিনি আমেরিকা থেকে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু আমি তাকে বলেছি, আপনি আমার খুবই ভালো বন্ধু হতে পারেন, কিন্তু আপনি আমাদের সঙ্গে ঠিক ব্যবহার করছেন না। ভারত আমাদের পণ্যে ৫২ শতাংশ শুল্ক বসায়, আমরা ২৬ শতাংশ বসালাম।”
ভারতের পণ্যের ওপর আগে যুক্তরাষ্ট্রে আড়াই শতাংশ শুল্ক বসানো ছিল। এখন তার সঙ্গে ২৬ শতাংশ যোগ হলে সব মিলিয়ে দাঁড়াবে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আগেই শুল্ক ছিল ১৫ শতাংশ; তার সঙ্গে এখন ট্রাম্প যোগ করলেন ৩৭ শতাংশ। ফলে দুই মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য ঢোকাতে ৫২ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। অর্থাৎ ১০০ ডলারের পণ্য রপ্তানি করলে ৫২ ডলার শুল্ক দিতে হবে।
কমেন্ট